অবশেষে মুখ খুললেন ডি কক

পরশু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার একাদশ দেখে চমকে উঠেছিলেন সবাই। দলের সেরা ব্যাটসম্যান কুইন্টন ডি কক নেই দলে! প্রথমে বলা হয়েছিল ব্যক্তিগত কারণে মাঠে নামেননি ডি কক। পরে জানা গেছে, ম্যাচের আগে  ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনে সংহতি জানাতে সবাইকে হাঁটু গেড়ে বসার নির্দেষ দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড। তা মানতে রাজি হননি বলেই ম্যাচে ছিলেন না এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান।

ডি ককের এ অবস্থান নিয়ে সমালোচনা উঠছে। অনেকেই তাঁকে বর্ণবাদী তকমা দিয়ে দিচ্ছেন। ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকাও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে বলে শোনা গেছে। এ ব্যাপারে গত দুই দিন চুপ ছিলেন ডি কক। আজ অবশ্য নিজের অবস্থান পরিস্কার করেছেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড আজ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তাতে কেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে তাঁকে দেখা য্যানি, সে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক অধিনায়ক।

কেন হাঁটু গেড়ে বসতে রাজি হননি, কেন তাঁর মনে হয়েছে, এমন নির্দেশ দেওয়ায় অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে, সেটা বিবৃতিতে ব্যাখ্যা করেছেন ডি কক। পুরো বিবৃতি এখানে তুলে ধরা হলো-

শুরুতেই আমার সতীর্থ ও দেশের সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি কখনোই এটাকে কুইন্টন ইস্যু বানাতে চাইনি। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্ব আমি ভালোভাবেই বুঝি এবং খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের যে উদাহরণ সৃষ্টি করার দায়িত্ব আছে, সেটাও জানি। যদি আমি হাঁটু গেড়ে বসলে অন্যরা শিক্ষিত হতো এবং অন্যদের জীবন সহজ হয়ে যেত, আমি খুশিমনেই তা করত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে না খেলে আমি কাউকে অসম্মান করতে চায়নি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে তো কোনোভাবেই না। অধিকাংশ মানুষ হয়তো বুঝতে পারেনি, ম্যাচ খেলার পথে, মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ আমাদের এটা জানানো হলো।

আমার কারণে যে দুঃখ, বিভ্রান্তি ও ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছে, এ জন্য আমি দুঃখিত। এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এত দিন চুপ ছিলাম আমি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, একটু ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। যারা জানে না, আমি নিজেই মিশ্র বর্ণের পরিবার থেকে এসেছি। আমার সৎবোনেরা কৃষ্ণাঙ্গ, আমার সৎ মা কৃষ্ণাঙ্গ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন আন্দোলন হচ্ছে বলেই না, জন্মের পর আমার জীবনে থেকেই ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস। কোনো একক ব্যক্তির চেয়ে সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা ও সবার মধ্যে সমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবারই অধিকার আছে এবং সেগুলো গুরুত্বপূর্ণএটা শিখেই আমি বড় হয়েছি।

আমার মনে হয়েছে যখন আমাকে ওভাবে একটা জিনিস করতে বলা হলো, আমার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। গত রাতে বোর্ডের সঙ্গে সর্বশেষ যে আবেগী আলাপ হলো, এখন তাদের উদ্দেশ্যটাও আমরা আরেকটু ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি। এটা আরও আগে করলেই ভালো হতো, তাহলেই ম্যাচের দিনের ঘটনাটা এড়ানো যেত।

আমি জানি আমাকে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের আগে বলা হয়েছিল, আমরা যা করতে চাই, সেটা করার স্বাধীনতা আমাদের আছে। আমি আমার ভাবনা নিজের কাছেই রেখেছি এবং আমার পরিবার ও দেশের হয়ে খেলার গৌরবের কথা ভেবেছি। আমি বুঝতে পারছিলাম না, যেখানে প্রতিটি দিন যখন সব ধরনের মানুষের সঙ্গে থাকি, তাঁদের ভালোবাসি, তাহলে কেন একটা আচরণ দিয়ে সেটা আমাকে প্রমাণ করতে হবে।

আপনাকে যখন কোনো আলোচনা ছাড়া কিছু করতে বলা হয়, তখন আমার মনে হয়েছে পুরো ব্যাপারটা অর্থহীন। আমি যদি বর্ণবাদী হতাম, আমি খুব সহজে হাঁটু গেড়ে বসতে পারতাম এবং মিথ্যা বলতে পারতাম, কিন্তু সেটা ভুল হতো এবং ভালো একটা সমাজ এতে সৃষ্টি হতো না। আমার সঙ্গে বেড়ে উঠেছে যারা, আমার সঙ্গে যারা খেলেছে, তারা জানে আমি কেমন মানুষ। একজন ক্রিকেটার হিসেবে আমাকে অনেক নামেই ডাকা হয়েছে।

প্রতিবন্ধী। বেকুব। স্বার্থপর। অবিবেচক। কিন্তু এসবে আমি কখনো কষ্ট পাইনি। ভুল বোঝাবুঝির কারণে বর্ণবাদী ডাকাতে পেয়েছি। এটা আমার পরিবারকে আহত করেছে। এটা আমার গর্ভবতী স্ত্রীকে দুঃখ দিয়েছে। আমি বর্ণবাদী নই। আমার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে আমি জানি সেটা। এবং আমাকে যারা চেনে তারাও জানে বলে আমার ধারণা। আমি জানি আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটা আমাকে ঘিরে আবর্তিত হওয়ায় কতটা দুঃখিত, সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। এখানে আমি মূল বিষয় না।

আমি মিথ্যা বলব না, এত গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচ খেলতে যাওয়ার পথে মানতেই হবে, না হলে...’—ইঙ্গিতপূর্ণ এমন একটা নির্দেশনা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছি। আমার মনে হয় না আমি একাই হয়েছি। আমরা ক্যাম্প করেছি, আমাদের সেশন ছিল। আমরা জুম মিটিং করেছি। আমরা জানি আমাদের অবস্থান কী। এবং সেটা হলো, এ ব্যাপারে সবাই সংঘবদ্ধ। আমি আমার সব সতীর্থকে ভালোবাসি। এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে ক্রিকেট খেলার চেয়ে বেশি আর কিছুই ভালোবাসি না।