সমন্বিত ও একীভূত শিক্ষা: বৈচিত্র্যকে কতটুকু বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে

একটি
দেশে নানা ধরনের মানুষ
বাস করে। মানুষে মানুষে
পার্থক্য থাকে ভাষায়, জাতিতে,
সংস্কৃতিতে, ধর্মে। পার্থক্য থাকে শারীরিক কাঠামোয়,
মানসিক চেতনায়। পুরুষ-স্ত্রী লিঙ্গভেদ এবং এ–বিষয়ক
দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতাও সমাজে দেখা যায়। জাতীয়
শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় এগুলোসহ সব
ধরনের বৈচিত্র্যকেই বিবেচনায় রাখতে হয়। এমনকি শিক্ষাক্রম
তৈরি এবং পাঠ্যপুস্তক রচনার
ক্ষেত্রেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। কিন্তু সর্বশেষ ২০১০ সালে প্রণীত
জাতীয় শিক্ষানীতিতে সমন্বিত বা একীভূত শিক্ষাকে
যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। শিক্ষাক্রমে বা পাঠ্যপুস্তকে সেগুলোর
প্রতিফলন কীভাবে ঘটবে, তার কোনো দিকনির্দেশনাও
সেখানে নেই।
প্রথমেই
আসা যাক, সমন্বিত বা
একীভূত শিক্ষা বলতে কী বোঝায়।
সব ধরনের বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে জাতীয় শিক্ষায়
তার প্রতিফলন ঘটানোকে সমন্বিত বা একীভূত শিক্ষা
বলে। কাজটি আপাতভাবে সহজ মনে হলেও
ব্যাপারটি খুব সহজ নয়।
এমনকি শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে এর
প্রতিফলন ঘটলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের দ্বারা সেটি সফল করা
সম্ভব না–ও হতে
পারে। এর জন্য শিক্ষক-সহায়িকায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হয়। শিক্ষককেও যথেষ্ট
প্রশিক্ষিত হতে হয়।
সর্বশেষ
শিক্ষানীতির প্রথম অধ্যায়ে ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য’ অংশে
৩০টি নীতিগত তাগিদের উল্লেখ আছে। এর মধ্যে
চারটিতে সমন্বিত বা একীভূত শিক্ষার
কথা বলা হয়েছে। এগুলো
লেখা হয়েছে এভাবে, ‘জাতি, ধর্ম, গোত্রনির্বিশেষে আর্থসামাজিক শ্রেণিবৈষম্য ও নারী-পুরুষ
বৈষম্য দূর করা’ (৭),
‘স্থানিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান
নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষালাভের সমান
সুযোগ-সুবিধা অবারিত করা’ (৮), ‘দেশের আদিবাসীসহ
সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ
ঘটানো’ (২৩) এবং ‘সব
ধরনের প্রতিবন্ধীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা’ (২৪)।
এসব
ধারণা শিক্ষাক্ষেত্রে কীভাবে প্রযুক্ত হবে, শিক্ষানীতিতে তার
উল্লেখ নেই। তা ছাড়া
কোনো বৈচিত্র্য কীভাবে শিক্ষাক্রমে বা পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত
হবে, সেটি কেবল বিষয়ভিত্তিক
শিক্ষক নির্ধারণ করতে পারেন না।
এর জন্য বিশেষজ্ঞের দরকার
হয়। যেমন পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে
লিঙ্গবৈচিত্র্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা
একজন জেন্ডার-বিশেষজ্ঞই নির্ধারণ করতে পারেন। আবার
কোন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধীর জন্য কোন উপায়ে
শিক্ষাদান ও মূল্যায়নের কাজ
করা হবে, তা কেবল
অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশেষজ্ঞই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
একজন
শিক্ষার্থী শিশুকাল থেকেই সমাজে নানা ধরনের বিভাজন
দেখে বড় হয়। দুঃখজনক
ব্যাপার হলো, যে পাঠ্যপুস্তক
পড়ে সে শিখতে থাকে,
সেখানেও বিভাজনের রেখাগুলো স্পষ্ট। অথচ পাঠ্যপুস্তকের মধ্য
দিয়েই শিশু ও তার
অভিভাবকের এবং প্রকারান্তরে সমাজের
দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটানো সম্ভব
ছিল। আমাদের পাঠ্যপুস্তকের ছবিগুলোতেও নানা অসংগতি দেখা
যায়। যেমন ছেলে ও
মেয়েসন্তানের সমান অংশগ্রহণ দেখাতে
সব সময় এমন পরিবারের
ছবি আঁকা হয়, যেখানে
একটি ছেলে ও একটি
মেয়েশিশু রয়েছে।
মজার
ব্যাপার হলো, পাঠ্যপুস্তকের সূত্র
ধরে বাস্তব সমাজেও এক ছেলে ও
এক মেয়ের কাঠামোটিকে আদর্শ পরিবারের রূপ হিসেবে ধরা
হয়! ফলে যেসব পরিবারে
দুটি মেয়ে বা দুটি
ছেলেশিশু রয়েছে কিংবা সংখ্যায় এর কমবেশি রয়েছে,
সেসব পরিবারের সন্তান ও অভিভাবকেরা একধরনের
হীনম্মন্যতায় ভোগেন। এই বাইরে তৃতীয়
লিঙ্গের ধারণাটিও পাঠ্যপুস্তকে প্রায় অনুপস্থিত। এ কারণে লিঙ্গ
বা জেন্ডারগত বৈচিত্র্য নিয়েও মানুষের মধ্যে অজ্ঞতা থেকে যায়।
আবার
ভাষার ক্ষেত্রে দেখা যায় চাকমা,
মারমা, সাঁওতালসহ সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা ভাষা সমস্যার সম্মুখীন
হয়। তারা শোনা-বলা-পড়া-লেখা সব
ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষা ব্যবহারে বাধ্য
হয়। যদিও প্রাথমিক শ্রেণিগুলোয়
পাঁচটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রয়েছে, তবে সেসব ভাষায়
পড়ানোর মতো শিক্ষক সংশ্লিষ্ট
এলাকাগুলোয়ও পাওয়া যায় না। তা
ছাড়া এসব শিশুর বাংলা
ভাষায় পাঠদান পদ্ধতি কেমন হবে, তা–ও শ্রেণিশিক্ষকদের জানা
থাকে না। ভাষাগত দুর্বলতার
মধ্য দিয়েই এসব জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা
শিক্ষার একেকটি স্তর পার হতে
থাকে।
প্রতিবন্ধিতার
ব্যাপারটি আরও গুরুতর। বিভিন্ন
শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের
নিয়ে গল্প বা পাঠ
আছে। এসব পাঠের উপসংহারে
বা মূল বক্তব্যে এদের
সঙ্গে এমন আচরণের কথা
বলা হয়েছে, যা পড়লে মনে
হয় এরা সমাজের ‘উপদ্রব’। কাউকে বা
কোনো শ্রেণিকে আলাদা চোখে দেখার ব্যাপারটি
সমন্বিত বা একীভূত ধারণার
সঙ্গে একেবারেই যায় না। অথচ
পাঠ্যবইগুলো এই ভুল কাজটিই
করে যাচ্ছে। তা ছাড়া যে
শিশুটি চোখে দেখে না
বা কানে শোনে না,
তার পাঠ গ্রহণ ও
প্রকাশের উপায়ও আলাদা হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক
তা মোটেও বিবেচনায় নেন না কিংবা
সেটি তাঁর জানা থাকে
না।
আমাদের
পাঠ্যপুস্তকগুলো চিন্তার পার্থক্য ও মতের বৈচিত্র্যকেও
মেনে নিতে শেখায় না।
কীভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে
হয় এবং অন্যের মত
গ্রহণ বা বাতিল করতে
হয়, তা রীতিমতো প্রশিক্ষণের
ব্যাপার। সমাজের বিজ্ঞজন বহুমতের বিদ্যমান বাস্তবতাকে স্বীকার করেন; এর অন্যথা হতে
দেখে হতাশ হন। কিন্তু
কীভাবে শিক্ষার্থী তা রপ্ত করবে,
তার কোনো নির্দেশনা পাঠ্যপুস্তকে
নেই। শ্রেণিকক্ষেও শিক্ষার্থীদের দিয়ে তর্কবিতর্ক বা
আলোচনার অনুশীলন করানো হয় না।
২০২৩
সাল থেকে শুরু হওয়া
যে শিক্ষাক্রমকে বাতিল করা হয়েছে, সেই
শিক্ষাক্রমে সমন্বয়ের ব্যাপারটিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তখন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন
ও শিক্ষক–সহায়িকা তৈরির সময়ে নানা ধরনের
বিশেষজ্ঞ মত গ্রহণ করা
হয়। নতুন করে শিক্ষা
কমিশন গঠনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
তবে তা না হলেও
পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে নতুন
করে শিক্ষাক্রম নিয়ে কাজ করা
দরকার। আর সহনশীল সমাজ
গঠনের স্বার্থেই সমন্বিত ও একীভূত শিক্ষাকে
সফল করা দরকার।








