চিরকাল অকৃত্রিম বন্ধুত্বের স্মৃতি হয়ে থাকবেন তারা
শোষণ আর বঞ্চনার দেয়াল ভাঙার দৃঢ়প্রত্যয় থেকে শুরু হয়েছিল বাংলার মানুষের মুক্তির লড়াই। এই লড়াইয়ের ইতিহাসের নানা বাঁকে ঝরাতে হয়েছে রক্ত। একাত্তরে দেশের আপামর জনতা অবিস্মরণীয় আত্মাহুতির ভেতর দিয়ে বিশ্বে আপন পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। যুদ্ধের শুরু থেকেই ধ্বংসযজ্ঞ, নির্মম হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও নিপীড়নের মর্মন্তুদ কাহিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। নাড়া দেয় বিশ্ববিবেক।
মানবিক ও সৃষ্টিশীল একেকজন মানুষ তাঁর নানা কর্মের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যুদ্ধের অমানবিকতার বিপক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে তারা পিছু হটেননি। বাংলাদেশের গণমানুষের গণআকাঙ্ক্ষার পক্ষে দিনের পর দিন লড়ে গেছেন তারা। বিবেকের তাড়না থেকেই মুক্তিকামী মানুষের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তারা।
আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হলো একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে শত্রুপক্ষের বর্বরতা ও নৃশংসতার সামনে আত্মপরিচয় নির্মাণে অকুতোভয় ছিল সব জাতি-গোষ্ঠী-ধর্মের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল ২৫ মার্চ কালরাতে। মর্মস্পর্শী সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য এখনও দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। যুদ্ধদিনে আত্মদানের ভেতর দিয়ে বাঙালি তার ইতিহাস বিনির্মাণের একেকটি কণ্টকাকীর্ণ পর্ব উত্তীর্ণ হয়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ জোরালোভাবে সোচ্চার হয়। সংগীত, কবিতা, চিত্র, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র ও লেখালেখি ছিল তাদের প্রতিবাদের ভাষা। এসব প্রয়াস বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ শব্দটির সঙ্গে আমরা প্রায় সবাই পরিচিত। ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষের ওপর নির্যাতন শুরু হলে সেতারসম্রাট খ্যাত রবিশঙ্কর বাদ্যযন্ত্র আর সংগীতের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত করেন বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য বন্ধু জর্জ হ্যারিসনকে। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে প্রায় ৪০ হাজার দর্শক নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক এক কনসার্ট। বিখ্যাত ওই কনসার্টে একের পর এক গেয়েছেন বব ডিলান, লিওন রাসেল, রিঙ্গো স্টারসহ আরও অনেকে। সবশেষে জর্জ হ্যারিসন গাইলেন বিখ্যাত গানটি। ‘মাই ফ্রেন্ড কেম টু মি, উইথ স্যাডনেস ইন হিজ আইজ/হি টোল্ড মি দ্যাট হি ওয়ান্টেড হেলপ/বিফোর হিজ কান্ট্রি ডাইজ... বাংলাদেশ বাংলাদেশ...’ চিরন্তন হয়ে থাকা তাঁর এই গানের সুর রচনা করে বাংলাদেশের মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন সেতারসাধক রবি শঙ্কর।
মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিন ঝুঁকি নিয়ে রণাঙ্গনের ছবি তোলেন। এরপর তা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে প্রমাণ দিয়েছিলেন, এ দেশের ওপর কেমন নিষ্ঠুর বর্বরতা চালানো হচ্ছে। লেভিনের অনেক ফুটেজ নিয়ে নির্মিত হয় ডকুমেন্টারি ছবি ‘মুক্তির গান’। এই ছবি প্রদর্শিত হয় বিশ্বের দেশে দেশে।
পল ও কনেট দম্পতি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে লন্ডনে জনমত তৈরিতে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে তারা প্রতিষ্ঠা করেন ‘অপারেশন ওমেগা’। এর মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশে খাদ্য ও ওষুধ পাঠান। এ ছাড়া তারা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে লন্ডনের ক্যামডেনে স্থাপন করেন ‘বাংলাদেশ অ্যাকশন’ নামে একটি দপ্তর।
মুক্তিযুদ্ধে কবিতা ও নানামাত্রিক শিল্পকর্ম ছিল অনেকের কাছে ‘যুদ্ধাস্ত্র’। কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি ছিল যেন একেকটি ‘বুলেট’। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ রাশিয়ার কবি আন্দ্রেই ভজনেসেনিস্ককে সঙ্গে নিয়ে নিউইয়র্কের সেন্ট জর্জ চার্চে কবিতা পাঠ করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন করেছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে লাতিন আমেরিকায় জোট বাঁধেন লেখক-শিল্পীরা। আর্জেন্টিনার খ্যাতনামা কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এর অগ্রভাগে ছিলেন। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা শোষিতের পক্ষে শোষণের বিপক্ষে এক অবিস্মরণীয় দলিল।
দূরের সেই বন্ধুর বেশির ভাগই আজ এ পৃথিবীতে নেই। তবু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অকৃত্রিম বন্ধুত্বের স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবেন তারা।








