সাহসের নাম ‘লাল মজলুম’

গণপরিবেশনা কতটা নান্দনিক ও হৃদয়স্পর্শী হতে পারে, তার জ্বলন্ত এক উদাহরণ হয়ে থাকল লাল মজলুম। গত ১৬ নভেম্বর ঢাকার রাজপথের এ গণপরিবেশনায় শিল্পীরা অভিনয়, গান, প্রতিবাদী প্রদর্শনী, পথনাটকে আন্দোলনের আবহ ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এদিন বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে শুরু হওয়া এই পথনাটক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ ও চারুকলা হয়ে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে গিয়ে শেষ হয়। যেখানে উঠে এসেছে ফকির-সন্ন্যাস বিদ্রোহ থেকে সরকার পতনের জুলাই-আগস্ট গণআন্দোলন এই ভূখণ্ডের রক্তঝরা ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে থাকা নানা সাহসের গল্প। 

লাল মজলুম-এর সূচনা হয়েছিল ঠিক এভাবে একদল ফকির-সন্ন্যাসী গান গাইছে রাজু ভাস্কর্যের সামনে। এমন সময় তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসে হেলমেট পরা একদল যুবক। কিন্তু এ হামলার শিকার হয়েও পিছিয়ে পড়ার পাত্র নয় এই ফকির-সন্ন্যাসীরা। তাই উদাত্ত কণ্ঠে আওয়াজ তুলে ছুড়তে থাকে অগ্নিবাণ। স্লোগান তোলে, আমার ভাই মরল কেন, জবাব দে জবাব দেস্বৈরাচার নিপাত যাকস্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালাও এক সাথে। এরপর মিছিল এগিয়ে চলে শাহবাগের দিকে। কিছু দূর যেতেই সেখানে আবারও হামলার শিকার হয়। বেশ কয়েকজন তরুণ লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তারপরও দমে না গিয়ে বারুদের মতো বিস্ফোরিত হয়ে হুঙ্কার তোলে।

 এ সময়ে তাদের মুখে শোনা যায়, বিভিন্ন আঞ্চলিক বাংলা ও আদিবাসী ভাষায় রূপান্তরিত উচ্চারণে কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা। একই সঙ্গে সরিয়ে ফেলে পেছনের দেয়ালে কালো কাপড়ে লেখা আমার হুকুমে সব চলবেএখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধআমার জীবন জনগণের জন্য নিবেদিত ইত্যাদি কথা সরিয়ে ফেলে তরুণরা। তার বদলে সেখানে স্থান পায়, ফকির সন্ন্যাস বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক সব আন্দোলনের চিত্রমালা। সেই সঙ্গে নিজেদের এখনও জীবিত বলে দাবি করতে দেখা যায়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ, ঊনসত্তরের শহীদ আসাদ, একাত্তরের তারামন বিবিসহ বীরযোদ্ধা ও শহীদদের। যাদের চরিত্র রূপায়ণের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা জানিয়ে দেন, তাদের মৃত্যু নেই বলেই সময়ের প্রয়োজনে তারা ফিরে আসেন বারবার। এর পরের অংশে উঠে এসেছে, আয়নাঘর গুঁড়িয়ে ফেলার দৃশ্য। যেখানে দেখা যায়, চলতে চলতে বিদ্রোহী দলটি একটি চারকোনা আকৃতির ঘর সামনে এসে পড়েছে। যার গায়ে লেখা, রাষ্ট্রীয় আয়নাঘর অথবা আরশিনগর। সেটিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করে না তারা। সেই আয়নাঘর ভাঙার পর সেখানে আবিষ্কৃত হয় কিছু মৃত মানুষের কঙ্কাল; যা দেখে শোকে বিহবল হয়ে পড়ে বিদ্রোহী তরুণেরা। বিলাপ করতে থাকে বুক চাপড়ে। 

এ সময় তাদের উজ্জীবিত করতে পাশে এসে দাঁড়ায় আরেকদল তরুণ। তারপর তারা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে এবং চলচল লাল মজলুম চল... স্লোগান দিতে দিতে পৌঁছে যায় শাহবাগে স্থাপিত জাতীয় জাদুঘরের সামনে। সেখানে প্রতীকী সংসদ সাজিয়ে এক অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। সেখানে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষদের কথা বলতে দেখা যায়, অভ্যুত্থান ও পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে। ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা এমনই সব কালজয়ী চরিত্র ও আন্দোলনের দৃশ্যপটে সাজানো লাল মজলুম ছিল অভিনব ও অনবদ্য গণপরিবেশনা। এককথায় বলা যায়, সাহসের নাম লাল মজলুম। 

যার নির্দেশনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহমান মৈশান। এ নির্দেশকের কথায়, ক্রাউড ফান্ডিংয়ে নির্মিত রাজপথ-গণপরিবেশনা লাল মজলুম, একদিকে শিক্ষার্থী-শ্রমিক জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত স্মৃতি যেমন পুনঃসৃজন করে, তেমনি এ জনপদে ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকেও একসূত্রে গ্রথিত করে।