পদ্মা সেতুর দুই পারজুড়ে বিপুল সম্ভাবনা

দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আর রাজধানীর মধ্যে বিশাল প্রমত্তা পদ্মা নদী। পারাপারে ভোগান্তি ছিল, দুই পারের ঘাটে মানুষ ও পণ্য ফেরির অপেক্ষায় বসে থাকত। দেশের বিরাট এক অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা স্থলপথে যুক্ত না থাকা ছিল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অন্তরায়। পদ্মা সেতু দিয়ে রাষ্ট্রীয় একীকরণও সম্পূর্ণ হলো। যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতুর পর পদ্মা সেতু সেই বিভক্তি দূর করেছে। দেশকে জোড়া লাগিয়েছে।
এক বছর আগেও মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় বরিশাল থেকে ঢাকায় আসা ছিল স্বপ্নের মতো ব্যাপার। পদ্মা সেতু চালুর পর তা প্রতিদিনের স্বাভাবিক ঘটনা। মাত্র ৩-৪ ঘণ্টার দূরত্বে চলে এসেছে খুলনা মহানগরী এবং মোংলা সমুদ্রবন্দর। আজ রোববার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে সেই স্বপ্নের সাহসী পদক্ষেপের।
পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে নামলেই চোখে পড়ে পরিবর্তন। দরিদ্র নাওডোবা এখন কর্মচঞ্চল উপশহরের চেহারা পেয়েছে। ঐতিহ্যবাহী নাওডোবা হাটের দোকানপাটও সব পাকা। পদ্মা সেতুর এই দক্ষিণ পারেই রয়েছে শেখ রাসেল ক্যান্টনমেন্ট, শেখ হাসিনা তাঁতশিল্প এলাকা এবং সেতুর সার্ভিস এরিয়া। এই ইউনিয়নের বুকের ওপর দিয়েই চলে গেছে পদ্মা সেতু থেকে নামা এক্সপ্রেসওয়ে। এক্সপ্রেসওয়ের দু’পাশে নির্মিত হচ্ছে গার্মেন্টস কারখানা, হিমাগার, পেট্রোল পাম্প ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক।
পদ্মা সেতু চালুতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা বাস্তবায়নে আরও কাজ বাকি। তবে সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যে কোনো জেলা থেকে সকালে রওনা দিয়ে ঢাকায় এসে কাজ সেরে আবার রাতের আগে ফেরা যায়। গত ১৪ জুন বরিশাল থেকে মাইক্রোবাসে ঢাকায় ফিরতে ফিরতে সেই অভিজ্ঞতাই হলো। গৌরনদী, মাদারীপুরের কালনী হয়ে গাড়ি পৌনে দুই ঘণ্টায় এসে পৌঁছাল ফরিদপুরের ভাঙ্গার ইন্টারচেঞ্জে। সেখানে চা পানের জন্য মিনিট ১৫ যাত্রাবিরতি। সেতু চালুর পর যান ও যাত্রীর চলাচল বেড়েছে, তাই সেখানে গড়ে উঠেছে বারোয়ারি দোকান।
‘এই ব্যবসাও তো পদ্মা সেতুর কারণে’
চা আড্ডায় কথা হলো স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘কলকারখানা হোক আর না হোক, পদ্মা বিরিজের (ব্রিজ) ঘাটে বইস্যা (বসে) দিন নষ্ট করার দিন চলে গেছে।’ পদ্মা সেতু চালুর এক বছরে এমন লাখো মোজাম্মেলের স্বস্তির গল্প শুনেছে দেশ। সময় সাশ্রয় ছাড়া আর কী সুবিধা হয়েছে পদ্মা সেতুতে– প্রশ্নে তিনি নিজের দোকান দেখিয়ে বললেন, ‘এই ব্যবসাও তো পদ্মা সেতুর কারণে হইছে। মানুষজন আসে, বেচাবিক্রি বাড়ছে। মালামাল সরাসরি ঢাকায় যায়। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার থেকে মালামাল সরাসরি আসে।’
ঢাকাকে পদ্মা সেতুর সঙ্গে জুড়তে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে বাধাহীন যান চলাচলের এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে নামে পরিচিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়কের কল্যাণে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুরের একাংশ এখন রাজধানী থেকে ঘণ্টাখানেক দূরত্বের এলাকা। বরিশাল থেকে ঢাকামুখী যাত্রায় ভাঙ্গা ইন্টারচেঞ্জ থেকে রাজধানীর বাবুবাজার সেতু (বুড়িগঙ্গা সেতু– এক ঘণ্টা লাগল ৭৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে।
পরিবহন ব্যবসা এগিয়েছে বেশি, তবে...
পদ্মা সেতুর সবচেয়ে সুফল পেয়েছে পরিবহন খাত। ঢাকা থেকে হাজারের বেশি বাস পদ্মা সেতু হয়ে চলছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। শুধু ঢাকা নয়, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর থেকেও চলছে বাস। গ্রিনলাইন, সোহাগ, শ্যামলী, এনার মতো বড় কোম্পানির বাস নেমেছে। ঢাকা-বরিশাল রুটে চালু হয়েছে এনা পরিবহন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, সেতু চালুর আগে সরাসরি বাস চালানোর সুযোগ ছিল না। সেতু এই সুযোগ করে দিয়েছে। যাত্রী, মালিক, শ্রমিক– সব পক্ষই লাভবান হয়েছে পদ্মা সেতুতে।
তবে সেতুর সুফল পুরোপুরি নেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রুটে নতুন বাসের পারমিট দিচ্ছে না সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেছেন, রুট পারমিট দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি)। হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে বাস চলাচলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আপত্তি রয়েছে। সে কারণে নতুন রুট পারমিট দেওয়া যাচ্ছে না।
পরিবহন মালিকদের ভাষ্য, বিআরটিএ সিটি করপোরেশনের অধীন সংস্থা নয়। সিটি করপোরেশনের সুপারিশে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে চলতেও রুট পারমিট দিচ্ছে না। পদ্মা সেতু হয়ে সব বাস অবৈধভাবে চলছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে পরিবহন নেতারা বলেছেন, ‘এই সমস্যার সমাধানে মাননীয় মেয়র মহোদয়কে নির্দেশ প্রদান করা প্রয়োজন।’
সুফল নিতে ঢাকা তৈরি নয়
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যেতে শুধু ঢাকা নয়– উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের যানবাহনকে পদ্মা সেতুতে যাওয়ার আগে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। কারণ, ঢাকার যানজট এড়িয়ে পদ্মা সেতু বা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যাওয়ার উপায় নেই।
ঢাকা এড়াতে রাজধানীর চারদিকে বৃত্তাকার সড়ক (ইনার সার্কুলার রুট) নির্মাণের পরিকল্পনা ও নকশা করা হলেও তা থমকে আছে সরকারি সংস্থাগুলোর টানাটানিতে। পাঁচ বছর আগেই সার্কুলার রুটের গাবতলী-বাবুবাজার-কদমতলী অংশের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা ও চূড়ান্ত নকশা করেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। এর একাংশের জমি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। তাই সংস্থাটিও সড়ক বানানোর কাজের দাবিদার। পদ্মা সেতুতে যেতে ইনার সার্কুলার
সড়কের গাবতলী-বাবুবাজার-কদমতলী অংশের ১২ কিলোমিটার নির্মাণ সবচেয়ে জরুরি। ২০১৫ সালে অনুমোদিত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসপিটি) তিনটি বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।
পদ্মা সেতু চালুতে ইনার সার্কুলার রুটের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। বিকল্প পথ না থাকায় ঢাকা থেকে পোস্তগোলা হয়ে চলে সেতুমুখী সব গাড়ি। এতে যাত্রাবাড়ী এলাকায় যানজট বেড়েছে। পদ্মা সেতুতে যাওয়ার ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়েতে যানজট কমাতে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের তাগিদ আসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠকে।
ইনার সার্কুলার সড়কের প্রথম অংশ অর্থাৎ পূর্ব অংশে ডেমরা থেকে বেড়াইদ-পূর্বাচল-তেরমুখ হয়ে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার সড়ক তথা ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ ও বাঁধ নির্মাণ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বাঁধ নির্মাণ শেষে তাতে সড়ক নির্মাণ করবে সওজ। কত বছর পর তা হবে– নিশ্চিত নয়। কিন্তু এই অংশে উড়াল সড়ক নির্মাণ করতে চায় সেতু কর্তৃপক্ষ। পাউবো সবে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা করছে। কিন্তু একই অংশে সমীক্ষা করবে সেতু কর্তৃপক্ষও।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেছেন, পদ্মা সেতু সঙ্গে সঙ্গেই সার্কুলার রুট নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল। তাহলে পদ্মা সেতুর সর্বোচ্চ সুফল মিলত।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষার (কত সালে করা) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে পদ্মা সেতুতে দিনে গড়ে দৈনিক ২৪ হাজার ৬০০ এবং ২০২৫ সালে ৪১ হাজার ৫৫০টি যানবাহন চলার কথা। নকশা প্রণয়নের সময় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল ২০২২ সালে দৈনিক গড়ে ২৩ হাজার ৯৫৪টি যান চলবে। তবে সেতু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষ ছয় মাসে ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৬২২টি যানবাহন চলেছে। দৈনিক গড়ে ১৪ হাজার ৭৪৩টি যানবাহন চলেছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ঢাকা হয়ে সেতুতে যাওয়ার নির্বিঘ্ন পথ না থাকায় যান চলাচল পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক কম।
তবে পদ্মা সেতুতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে টোল বাবদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫৭ কোটি টাকা বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। সমীক্ষা এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী গাড়ি চলার ব্যবস্থা করা হলে আয় আরও বেশি হতো। বিনিয়োগও দ্রুত উঠে আসত।
শিল্পের হাতছানি, কর্মসংস্থানের আশা
পদ্মা সেতু জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ বাড়াবে বলে প্রকল্পের সমীক্ষায় বলা হয়েছিল। এক বছরেই এ প্রবৃদ্ধি হবে না। সে কথা বলছিলেন ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। তিনি বরিশালের বিসিক শিল্প মালিক সমিতিরও সভাপতি। সেখানেই ফরচুনের জুতার কারখানা। তিনি বলেছেন, এক বছর খুব অল্প সময়। পদ্মা সেতু যোগাযোগের ভিত গড়ে দিয়েছে। তা কাজে লাগিয়ে শিল্প গড়ে উঠবে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সুবিধা থাকতে হবে। শিল্পসহায়ক পরিবেশ দিতে হবে। তিনি জানান, বরিশাল বিসিকের কোনো প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেই। কারণ, সিটি করপোরেশন নবায়ন করেনি। পদ্মা সেতুর কারণে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে সরকারের সব সংস্থার সহযোগিতা লাগবে।
পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী যোগাযোগ বেড়েছে। চিকিৎসা, কেনাকাটা, ব্যবসার জন্য এসব জেলার বাসিন্দারা আগের চেয়ে বেশি ঢাকামুখী হয়েছেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্তের শঙ্কা রয়েছে। এমন অভিমত মাদারীপুরের শিবচরের শিহাবুল ইসলাম সাগরের। তিনি সমকালকে বলেছেন, স্থানীয় সমৃদ্ধির জন্য কর্মসংস্থান প্রয়োজন, যাতে মানুষজন এলাকা না ছাড়ে।
নারায়ণগঞ্জে ছোট গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের হাবিবুর রহমান রাসেলের। তিনি সমকালকে জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সুবিধা থাকলে কারখানা নিজের এলাকায় সরিয়ে নেবেন। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন।
এসব অবকাঠামো নির্মাণ হলে পুরো এলাকার চিত্র বদলে যাবে মনে করেন সিরাজদীখানের আবদুল্লাহপুরের বাসিন্দা ইমতিয়াজ হোসেন রুবেল। তিনি বলেছেন, সড়কের আশপাশে প্রতি কাঠা কৃষি জমির দাম পাঁচ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। যেসব ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সেই অনুযায়ী ভবন, কারখানা হলে পুরো এলাকা উন্নত হয়ে যাবে।
দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিলের পর প্রশ্ন ছিল, কীভাবে নির্মাণ হবে পদ্মা সেতু? জবাব ছিল, সেতু নির্মাণ সম্ভব না। অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে অপার সম্ভাবনার সেতু।








