‘ফুলটাইম’ রাজনীতিক হওয়াই শেষ কথা নয়

বাংলাদেশ এক সময় অনেক কালজয়ী রাজনীতিক পেয়েছিল, যাঁদের অনেকেই ছিলেন ফুলটাইম পলিটিশিয়ান। যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা, পাকিস্তানি দুঃশাসন, গণঅভ্যুত্থান আর স্বাধীনতা আন্দোলন তাঁদের জীবদ্দশায় কোনো নির্দিষ্ট পেশা গ্রহণ করতে দেয়নি। এমনকি সংসার জীবনেও তাঁরা তেমন একটা সময় দিতে পারেননি। অনেকেই পারেননি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করতে। তাই সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ফুলটাইম রাজনীতিক হওয়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না।

 

কিন্তু স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও আজ তথাকথিত ফুলটাইম রাজনীতিকদের ছড়াছড়ি। ’৯০-এর পরে খুব বড় কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন এ দেশে হয়নি। কিন্তু রাজনীতিকদের একটা বড় অংশ ‘ফুলটাইম’ হয়ে গেছে। অনেক রাজনীতিবিদই নির্বাচনী হলফনামায় পেশার ঘরে লেখেন ‘রাজনীতি’। কী অদ্ভুত! এরা নির্বাচন করে কোন খাত থেকে অর্জিত অর্থ খরচ করে? এমন তো নয়, আমেরিকার মতো এখানে পলিটিক্যাল পার্টিগুলো সারাদেশ চষে বেড়িয়ে ফান্ড জোগাড় করে। অথবা জার্মানির মতো সব দলকে নির্বাচনী খরচ বহন করার জন্য রাষ্ট্র নিজেই তহবিল জোগায়।

 

উচ্চ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একই অবস্থা। যে দেশে দরকার ছিল দক্ষ জনশক্তি, যারা দেশে ও বিদেশে তাদের যোগ্যতা দিয়ে কাজ করে দেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারত, সেখানে এ দেশ পেল অপ্রয়োজনীয় আর অতিরিক্ত রাজনীতিক। এক সময় বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন– ‘সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পাইছি চোরের খনি।’

চৌর্যবৃত্তি রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করেছে। রাজনীতি মুনাফাখোরি ব্যবসাতে পরিণত হওয়ার কারণে দলে দলে অকর্মণ্য, বেকার, দুশ্চরিত্র, ভবঘুরে, অশিক্ষিত, অপরাধপ্রবণ আজ রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোতে আস্তানা গেড়েছে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও এরা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। সকাল বেলায় শার্ট-প্যান্ট অথবা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে ফুলবাবু সেজে এরা রাজনৈতিক কার্যালয়ে চলে আসে এবং অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে।

 

এত অহেতুক ‘নিবেদিত’ রাজনীতিবিদ কি আদৌ আমাদের দরকার আছে? গত ৩০ বছরে দেশের যতটা আগানোর কথা ছিল, ততটা আগাতে পারেনি। বরং অপরাজনীতি এবং দুর্নীতি দেশকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। রাজনীতি যদি কলুষিত না হতো, তবে দেশের সমাজ, অর্থনীতি বা প্রশাসনিক কাঠামো এতটা নষ্ট হতো না। শিক্ষিত, প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের হাত ধরে যেখানে দেশ উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারত, সেখানে বর্তমানের রাজনীতিকদের অনুদার, কপট আর অসৎ মানসিকতার কারণে ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের।

কর্মজীবী আর কর্মহীন রাজনীতিকদের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যাবে, কর্মহীনরাই রাজনীতিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এরা নিজের এবং নিজের পরিবারের সদস্যসহ সবার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চায় রাজনীতির ভোজবাজির মাধ্যমে। দেশ রসাতলে গেলেও এদের কিছু যায় আসে না। অতিরিক্ত সময় এরা তথাকথিত রাজনীতির পেছনে ব্যয় করার কারণে অনেক সময় এরা অপ্রয়োজনীয় কাজ করে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর বিভাজনকে প্রশ্রয় দেয়। সহজ জিনিসকেও এরা সহজ রাখে না। অহেতুক যে কোনো কাজকে জটিল করে এরা তার মধ্যে অপরাজনীতি প্রবেশ করাতে চায়। তিলকে তাল বানাতে তারা সদা ব্যস্ত। এদের কাছে জনস্বার্থের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থ গুরুত্ব পায় বেশি। তাই তো, স্বাধীনতার এত বছর পরেও বাংলাদেশিরা এক হতে পারেনি। বিভাজনের রাজনীতি আজও আমাদের যাবতীয় ক্ষেত্রকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

 

ফুলটাইম রাজনীতিকরা রাজনীতি বলতে শুধু ক্ষমতায় যাওয়াকেই বোঝে। ক্ষমতায় যেতে পারলে রাতারাতি তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। চেহারায় একটা তৈলাক্ত ভাব আসে। আবার ক্ষমতা হারালে এরা যেন বেলুনের মতো শারীরিকভাবে চুপসেও যায়। চেহারার জৌলুসও তখন হারিয়ে যায়। তাই এ দেশে কেউ ক্ষমতাহীন রাজনীতিক হতে চায় না। সরকার গঠন বা পরিচালনাকে এ দেশের রাজনীতিকরা ‘দায়িত্ব’ ভাবে না। তা তাদের কাছে আলাদিনের চেরাগের মতো, যা খুশি তা করার যন্ত্র। ক্ষমতা হাতে পেলে ফুলটাইম বেকার রাজনীতিকও কোনো কোনো ব্যবসায়ের অংশীদার হয়ে ওঠে রাতারাতি। কমিশন গ্রহণের জন্য নিজের বাসাতেই আলাদা অফিস খুলে বসে। ভুয়া কোম্পানি বানিয়ে নিজে তার ম্যানেজিং ডিরেক্টরে পরিণত হয়।

 

রাজনীতি যতদিন এ অযোগ্য মানুষের কবল থেকে মুক্ত না হবে, ততদিন এ দেশ থেকে দুর্নীতি যাবে না; গণতন্ত্রও কিতাব থেকে বাইরে আসবে না। রাজনৈতিক দলগুলো আজও এ দেশে ইনস্টিটিউশন হতে পারেনি; যেখানে রাজনৈতিক সদস্যপদ দেওয়া হবে যোগ্যতার নিরিখে; অযোগ্য আর অসৎকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হবে। পুরোদস্তুর সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি আর চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরাও এ দেশের সংসদ সদস্য হয় শুধু কথিত ফুলটাইম রাজনীতিক হওয়ার কারণে। যতদিন এদের হাতে দেশ, ততদিন বারবার পথ হারাবে বাংলাদেশ।

 

জনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দলীয় স্পষ্ট নীতিমালা করে দেওয়া দরকার। যার পেশাগত পরিচয় আর যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের কোনোভাবেই রাজনৈতিক দলে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। এদের কারণে শিক্ষিত আর সৎ পেশাজীবী ব্যক্তিরা রাজনীতিবিমুখ। কারণ, তাঁরা অসৎ ফুলটাইমারদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় নামতে চান না। 

 

এম আর ইসলাম: শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়