দুর্বল শেয়ারে হুমড়ি খেয়ে তৃতীয় দিনেই হতাশা

বন্ধ ও লোকসানি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ পুনর্গঠনে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক
সংস্থা বিএসইসির উদ্যোগের পর দুর্বল এসব কোম্পানির শেয়ার দর যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল,
তা থেমেছে। আরও বেড়ে যাবে ভেবে দাম বাড়িয়ে যারা শেয়ারগুলো কিনেছেন গত দুই দিনে, তারা
এখন পুঁজি হারানোর শঙ্কায়।
আগের দুই কার্যদিবসে সর্বাধিক দর বৃদ্ধির তালিকায় এসব লোকসানি প্রতিষ্ঠানের
প্রাধান্য থাকলেও সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস সবচেয়ে বেশি দর হারানোর তালিকায় এসব প্রতিষ্ঠান।
গত দুই দিনে যারা শেয়ারগুলো কিনেছেন, তাদেরকে বিক্রি করতে আরও এক সপ্তাহের
বেশি অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, এই শেয়ারগুলো বিক্রি করা যায় ১০ কার্যদিবস পরে। তত দিনে
আরও কমে গেলে আরও বেশি হতাশ হতে হবে বিনিয়োগকারীদের।
বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হওয়া ৩৫৭টি শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল
ফান্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারানো ১৬টি কোম্পানির মধ্যে ১৪টিই বন্ধ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠান।
বিএসইসি চলতি সপ্তাহে ইউনাইটেড এয়ার, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, ফ্যামিলি
টেক্স ও এমারেল্ড অয়েলের বোর্ড পুনর্গঠনের পর এই শেয়ারগুলোর দাম বেড়েই চলছিল।
এর মধ্যে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ও এমারেল্ড অয়েলের দর টানা দিন দিন বেড়েছে
একদিনে যত বাড়া সম্ভব ততই।
তবে পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বিনিয়োগকারীদেরকে সতর্ক করে দিয়ে আসছিলেন
যে, বোর্ড পুনর্গঠন মানেই কোম্পানির উৎপাদন চালু হবে এমন না। নতুন বোর্ড কোম্পানির
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কী করা যেতে পারে তার সুপারিশ করবে। তারা কোম্পানি অবসায়নের
পরামর্শও দিতে পারে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেছেন, বোর্ড
পুনর্গঠনের খবরে ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে কারসাজির চেষ্টা করা হতে পারে। এ নিয়ে সতর্ক থাকতে
হবে।
দুরন্ত গতিতে ছুটতে থাকা দুর্বল শেয়ারের দরপতন
সোমবার এমারেল্ড অয়েলের দাম বাড়ে ১০ শতাংশ। পরের দুই দিনও বাড়ে প্রায়
একই হারে। তবে আরও বাড়বে ভেবে যারা শেয়ারটি কিনেছেন, তারা এখন দুশ্চিন্তায়।
কারণ, এই শেয়ারটি এক দিনে দর হারিয়েছে ৮.২৭ শতাংশ।
একই পরিস্থিতি আরেক বন্ধ প্রতিষ্ঠান সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের দরে। গত
সোম থেকে বুধবার পর্যন্ত শেয়ারটির দাম এক দিনে যত বাড়া সম্ভব, বেড়েছিল ততই। আর এবার
দাম কমেছে এক দিনে যত কমা সম্ভব ততই।
বিআইএফসি, ফ্যামিলি টেক্স, তুংহাই নিটিং তাল্লু স্পিনিং, বিডিওয়েল্ডিং,
মিথুন নিটিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, এপোলো ইস্পাত, আইএলএফএসএল, ফাস ফিনান্সও ব্যাপকহারে
দর হারিয়েছে, গত কয়েক দিনে যেগুলোর দর কেবল বেড়েই চলেছিল।
কী বলছেন বাজার বিশ্লেষক
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ‘কোনো বিনিয়োগকারী
যখন এককভাবে জেড ক্যাটাগরির শেয়ার কেনেন তখন তিনি তার ইচ্ছায় কিনেন। কিন্ত যখন সার্বিক
বাজারে জেড ক্যাটাগরির উত্থান হয় তখন স্বাভাবিকভাবে বলা যায় এখানে কারসাজি হচ্ছে। বা
গুজব ছড়ানো হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘জেড ক্যাটাগরির শেয়ারের উত্থান সাময়িক।
এখন আবার কমে গেছে। খারাপ কোম্পানির শেয়ার জেনে বুঝে কিনে লোকসান হলে দায় কে নেবে?
তবে পরামর্শ হচ্ছে, লাভ হলেই কিনতে হবে এ ধারণা থেকে বিনিয়োগকারীদের বের হয়ে আসা উচিত।’
পুঁজিবাজারে বর্তমানে টি প্লাস ওয়ান প্রক্রিয়ায় শেয়ার বেচা কেনা হয়।
আর জেড ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে টি প্লাস টেন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। জেড ক্যাটাগরি
বাদে যে কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনে একদিন পর বিক্রি করে দেয়া যায়, যা আগে ছিল তিনদিন।
আর জেড ক্যাটাগরির শেয়ার কেনারে দশদিন পর বিক্রি করা সম্ভব হয়, যা আগে ছিল সাতদিন।
ফলে এই সময়ে যারা জেড ক্যাটাগরির শেয়ার কিনেছেন তাদের আর অন্তত সাত থেকে
নয় কর্মদিবস অপেক্ষা করতে হবে শেয়ার বিক্রির জন্য। অর্থাৎ তারা আগামী সপ্তাহেও শেয়ারগুলো
বিক্রি করতে পারবেন না। কারণ, এক সপ্তাহে কর্মদিবস থাকে সর্বোচ্চ পাঁচটি।
বেক্সিমকো, রবি, ফার্মার রাজত্ব
লেনদেনে তিন কোম্পানির রাজত্ব দেখা গেল সপ্তাহের শেষ দিনে। বেক্সিমকো
লিমিটেড, রবি আজিয়াটা আর বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার হাতবদল হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
অবশ্য গত এক মাসে আগ্রহের কেন্দ্রে আসা বিএটিবিসির শেয়ারেরও বিপুল পরিমাণ
ক্রেতা ছিলেন। তবে সেই তুলনায় বিক্রেতা ছিল কম। তার পরেও সর্বাধিক হাতবদল হওয়া শেয়ারের
মধ্যে পঞ্চম স্থানে এই কোম্পানিটি।
গত ডিসেম্বর থেকেই বেক্সিমকো ও বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার নিয়ে হুলুস্থুল
চলছে। প্রায় প্রতিদিনই লেনদেনের শীর্ষে থাকে বেক্সিমকো লিমিটেড।
সম্প্রতি পিপিই শিল্প পার্ক স্থাপনে ৯০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বেক্সিমকো।
এখান থেকে বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করার আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে
যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে পণ্য কেনার চুক্তি করেছে।
সর্বশেষ সুদবিহীন সুকুক বন্ড ছেড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা তুলে দুটি সৌরচালিত
বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ।
কোম্পানিটির ১ কোটি ৬ লাখ ৯৯ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যার বাজার মূল্য
ছিল ৮৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
রবির শেয়ারও লেনদেন শুরুর পর থেকে আগ্রহের তুঙ্গে। তবে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে
লভ্যাংশ না দেয়ার সিদ্ধান্ত দেয়ার পর কিছুদিন হাতবদল হয়েছে কম। যদিও গত এক সপ্তাহ ধরে
আবার আগ্রহী হয়ে উঠছেন বিনিয়োগকারীরা।
এই কোম্পানিটির ১ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার শেয়ার লেনদনে হয়েছে ৫৩ কোটি ৫৫
লাখ টাকায়।
বাংলাদেশে বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি সানোফি-অ্যাভেন্টিসের
৫৪.৬ শতাংশ শেয়ার কিনেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রায় সাড়ে তিন কোটি পাউন্ড
মূল্যে এই শেয়ার কেনা হয়েছে। বাংলাদেশি টাকায় শেয়ারের দাম পড়ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
লেনদেনের শীর্ষ ২০ কোম্পানির মধ্যে তৃতীয় স্থানে ছিল বেক্সিমকো ফার্মা,
যার ২৪ লাখ ৮১ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকায়।
খাতভিত্তিক দিনের লেনদেন
ব্যাংক খাতে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর বেড়েছে ১১টির, কমেছেও সমসংখ্যকের।
তবে পাল্টায়নি আটটির দর।
প্রকৌশল খাতেও বেশির ভাগকোম্পানির শেয়ারের দর পাল্টায়নি। ৪২টি কোম্পানির
মধ্যে অপরিবর্তিত ছিল ১৯টির দর। বেড়েছে নয়টির আর বাকি ১৪টির দর কমেছে।
ব্যাংক বহির্ভূত ২৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর বেড়েছে তিনটির, কমেছে
১৬টির। অপরিবর্তিত চারটির দর।
বিমা খাতেও লেনদেন কোম্পানির শেয়ারের দর বেড়েছে। ৪৯টি কোম্পানির মধ্যে
দর বেড়েছে ৩৭টির, কমেছে পাঁচটির। অপরিবর্তিত সাতটির দর।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ২১ কোম্পানির মধ্যে বেড়েছে আটটির দর, কমেছে
১১টির। দর পাল্টায়নি দুটির।
সূচক ও লেনদেন
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের-ডিএসই প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৭ দশমিক ৭০ পয়েন্ট
বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে।
শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসইএস ৫ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে
১ হাজার ২৪৮ পয়েন্টে।
বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ২০ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বেড়ে
দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১১২ পয়েন্টে।
লেনদেন হওয়া ৩৫৭টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১০০টির,
কমেছে ১৫০টির ও পাল্টায়নি ১০৭টির দর।
লেনদেন হয়েছে ৭০৭ কোটি টাকা। আগের দিন ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছিল ৭৭৫
কোটি টাকা। এ হিসেবে লেনদেন কমেছে ৬৮ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে- সিএসই প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৬০ দশমিক ২৯
পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৭৬ পয়েন্টে।
লেনদনে হওয়া ২৫০টি কোম্পানির ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৮০টির,
কমেছে ১০৫টির ও পাল্টায়নি ৬৫টির।
লেনদেন হয়েছে ৭৯ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি দর বাড়া কোম্পানি
বৃহস্পতিবার ডিএসইতে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ দর বেড়ে শীর্ষে ছিল রহিমা ফুড।
নতুন তালিকাভুক্ত ই জেনারেশনের দর টাকা অষ্টম কার্যদিবসেও বেড়েছে এক
দিনে যত বাড়া সম্ভব তত। ১০ টাকায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির শেয়ার দর আরও ৯.৭৪ শতাংশ
বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ টাকা ৪০ পয়সা।
এছাড়া বিকনফার্মার শেয়ার দর বেড়েছে ৮ দশমিক ০২ শতাংশ। প্যারামাউন্ড ইন্স্যুরেন্সের
শেয়ার দর বেড়েছে ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। জিবিবি পাওয়ার লিমিটেডের শেয়ার দর বেড়েছে ৬ দশমিক
৮৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি দর বৃদ্ধির তালিকায় আরও ছিল ওরিয়ানফার্মা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল
লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স।
বিএটিবিসির শেয়ার দরপতনের সবার শীর্ষে দেখালেও আসলে এর দাম বেড়েছে এক
দিনে যত বাড়া সম্ভব ততই। একটি শেয়ারে দুটি বোনাস শেয়ার প্রস্তাব করায় কোম্পানিটির সমন্বয়কৃত
দাম ছিল ৫১৮ টাকা। কিন্তু বিক্রি হয়েছে ৫৫৬ টাকা ৮০ পয়সা।








